আগুন নাটক(গদ্যরূপ)
বিজন ভট্টাচার্য
সেইদিন ছিল একটি ভোর বেলা । সংসারে টুকিটাকি জিনিসগুলো কিছুই সে রকম দেখা যাচ্ছিলনা । এরকম পরিবেশে দেখা যাচ্ছিল বলতে শুধুমাত্র একটি মাটির জালা । বাঁশ টাঙানো ছিল বাঁশের উপরে ছিল দু-একটা নোংরা
কাপড়, একটা ছেঁড়া চট ও কাঁথা ।
মেঝের উপরে নিত্য , নিত্যর মা ও নিত্যর বাবা কাপড় মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছিল, তখন আকাশটা নীল রঙের হয়ে উঠেছিল।
ধীরে ধীরে ভোর হতে লাগলো । কিছুক্ষনের মধ্যে হঠাৎ একটা মোরগ ডেকে উঠলো । পরিবেশটা এক্কেবারে চুপচাপ হয়ে উঠেছিল তখন পাশের গ্রাম থেকে একটা আযানের শব্দ ভেসে আসছিল এবং একটা কাক ডেকে উঠলো ।
নেত্যের বাবা ঘুম থেকে উঠে কি যেন একটা বিড়বিড় করে নিজে নিজেকেই বলতে লাগলো, "আগের দিন মনি চাঁদ বলে একজন ব্যক্তি তিনি চাল আনতে গিয়ে লাইনের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারপর চাল পেল তো একে বারে বেলা
বারোটা বেজে গেল" আরো বললো "গ্রামের কুরণের মা তো শুধু হাতে ফিরে এসেছিল চাল না পেয়ে "।
এই বলতে
বলতে ঘুম থেকে ওঠে নেত্যুর বাবা একটা বিড়ি ধরালো । বিড়ির আগুনে ই চারদিক মনে হচ্ছিল যেন সুস্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে । নিত্যকে বকাবকি করে বলছিলো "নিত্য খুব আরাম করে ঘুমোচ্ছিস তো , চাল আর পাবিনা আজ!"।
তারপরে নেত্যুর বাবা , নেত্যুর মা যখন ঘুমাচ্ছিলো তখন ঠেলামেরে বলে উঠলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট না করতে ।
নৃত্যের মা দাতুনকাটি শাকসবজি বিক্রি করতো তবে তাদের চাল কেনা হতো এবং ভাতের হাড়ি চড়ত। নেত্যের বাবা
নেত্যের মাকে বলল সব কিছু গুছিয়ে নাও, তবুও ওর মা ঘুম থেকে না ওঠায় নৃত্যের বাবা একটু রেগে গামছা খানা একটু ঝেড়ে কাঁধের উপর ফেলে সেখান থেকে তাড়াহুড়ো করে চলে গেল।
নৃত্যের মা ডাকল নিত্যুকে এবং নিত্য ঘুম
থেকে উঠে বলল "ঘুমার জোনেই একটু শান্তি করে ঘুমাতেও দেয়না"। তারপরে নিত্যর মা বাজারে সবকিছু একটি ঝুড়ি তে গুছালো এবং কলমি শাকগুলোর উপরে কিছুটা জলের ঝাপটা মারল যাতে শাক গুলো টাটকা থাকে । নিত্য
এবং তার মা দুজনে তাড়া তাড়ি করে সবকিছু গুছিয়ে বাজারের দিকে হাঁটতে লাগলো ।
অন্যদিকে একখানা চালাঘর সামনে ছোট্ট একটু উঠান সেইখানে দাঁড়িয়ে ছিল একজন কৃষাণী , আর একটা খোলা
জানালার কাছে তার স্বামী কৃষান দাঁড়িয়ে ছিল। সে খালিগায়ে দাঁড়িয়ে মাথায় গামছা বেঁধে , হাতে একটি কাস্তে নিয়ে পিঠ চুলকাচ্ছিল। তারপর কিষান তার কৃষানিকে বলতে লাগলো কিছুদিনের মধ্যে যদি চৌত ফসলগুলো
তুলতে পারে তাহলে তারা নিশ্চিন্ত হবে । তখন কৃষানি তার দিকে তাকিয়ে একটু হালকা হাসলো এবং কৃষান একটু
রেগেগেলো! তখন হয়তো খাবারের খুব অভাব ছিল সেই কারণে কিষান তার বউকে বলছিল তার স্ত্রী যখন চাল
আনতে যাবে চাল নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসতে । কারণ কৃষান মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে এসে খিদের জ্বালায়
আর থাকতে পারে না । কিন্তু তার স্ত্রী অনেক দে রি করে ফিরে এসে রান্না করে এবং তাঁদের খাওয়া হয়। হঠাৎ বাইরে
তাঁদের একটা গরু হামলে উঠলো কৃষাণ গরুটা কে বলল "মাঠে যাওয়ার জন্য এক্কে বারে পাগল হয়ে গেছে "। কৃষাণ
যখন কৃষাণী কে বলল কেষ্টের মার সঙ্গে আগে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে পারিসনি তখন কৃষানী তার দিকে তাকিয়ে মৃদু
হাসলো , কিষান তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলো কেন তার দিকে সে ওই ভাবে তাকাচ্ছিলো , এই বলে সে সেখান থেকে
চলে গেল।
অন্যদিকে দূরে কিসের একটা ভোঁ আওয়াজ শোনা যাচ্ছিলো । ছোট্ট একটা বারান্দার উপরে একজন ব্যক্তি তার নাম
সতীশ সে উবু হয়ে বসেছিল। সতীশ ছিলেন কারখানায় কাজ করা একজন শ্রমিক। সতীশের শরীরটা ছিল খুব
শক্তপোক্ত এবং তার মাথার চুলগুলো ছিল উস্কো খুস্ক। সতীশের একটি মেয়ে ছিল তার নাম ছিল ফুলকি । ফুলকি ও তার মা ঘরের ভিতরে ঘুমাচ্ছিল। সতীশ তার মেয়ে কে ডাকল তবুও না ওঠায়, সতীশ ওর মেয়েকে বলল কুম্ভকর্ণের মত ঘুমাচ্ছিস সেই সন্ধ্যে বেলা থেকে । এবং সতীশের বউ এর উদ্দেশ্যে ওর মেয়েকে বলল "মা যেমন বেটি তেমন"।
সতীশের এক বন্ধু ছিল তার নাম জুড়োন। তারা দুজনে একটি কারখানায় কাজ করতো । কিন্তু তাদের খাবারের খুব অভাব ছিল তখনকার দিনে । সতীশ জুড়োন কে বলল জুড়োন তো একলা মানুষ হোটেলে গিয়ে খেয়ে নেই কিন্তু সতীশ সবদিন লাইন এ দাঁড়িয়েও, চাল পেতোনা , শুধু হাতে ফিরে আসতে ও হতো । আগে দিন তার বৌ ও মেয়ে লাইন এ দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরে এসে ছিলো । সতীশ সেইদিন রাত্রে মিস্ত্রির কাছে থেকে দের পোয়া চাল আনে দিয়ে তাঁদের খাওয়া হয়। একদিন সকাল বেলা সতীশকে এতটা খিদে লেগে ছিল যে তার পেটে আগুন লেগে
গিয়েছিলো । এই অবস্থায় কি করে কোম্পানি যাবে । সতীশ ও জুড়োন কোম্পানির উপর ভরসা না করার কথা
বলছিলো , কিন্তু তাদের কিছু করার ছিল না কাজ যে করতেই হতো । এই কথা তার বন্ধুকে বলতে বলতে সতীশ তার
মেয়ের উপরে রাগ দেখাতে লাগলো আর বলছিল "তোর ঘুমের নিকুচি পড়েছ"। সতীশ তার মেয়ে কে যখন
বকা বকি করছিল তখন সত্শে র বউ ক্ষিরি মেয়ের দিকে হয়ে বলছিলো "মেয়ে মানুষ কি আর করবে" । ক্ষিরি
সতীশকে গালাগালি করছিল কারণ সকালবেলায় এক পোয়া চালের ভাত সব খেয়ে নিয়েছিল। হঠাৎ কিছুক্ষণের
জন্য তাদের স্বামী -স্ত্রীর ঝগড়া বেধে গেল। তখনকার দিনে খাবার কাপড় ভাত কোন কিছুই ছিল না সে রকম
কথা গুলো ক্ষি রি সতীশকে বলতে লা গলো যে তা রও সে গুলো ছি ল না । সত্যি ছে লে কে গি য়ে ক্ষি রি কে বলল যে মুখ
সামলে কথা বলবা না হলে লাথি মারবো । এই ঝা মে লা র মধ্য দি য়ে সতী সহ্য করতে না পেরে সে জামা কাপড় কাঁধের
উপরে নিয়ে একটা গামছা সঙ্গে করে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।